পৃথিবীর নিচে কি রয়েছে? কখনো কি কল্পনা করে দেখেছেন? যদি আমরা মাটির নিচে কন্টিনিউ খনন করে যাই, সমুদ্রের থেকেও নিচে মাউন্ট এভারেস্টের উচ্চতার থেকেও নিচে খনন করে যাই তাহলে আমরা কোথায় পৌঁছাবো? যদি বিজ্ঞানীরা পৃথিবী থেকে সাড়ে কোটি কিলোমিটার দূরে মঙ্গল গ্রহ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। তাহলে কেন আমরা পৃথিবীর ভিতর 12,740 কিলোমিটার লম্বা গর্ত করতে গিয়ে বারবার ব্যর্থ হয়ে যায়? আজকের এই ব্লগ পোস্টে জানবো ভূপৃষ্ঠের নিচে কি এমন রহস্য লুকিয়ে রয়েছে যা বড় বড় ড্রিল রিককেও দুর্বল করে দেয়। সর্বপ্রথম শুরু করা যাক পৃথিবীর সবথেকে উপরের লেয়ার
থেকে যেখানে আমরা বাস করি। আর এখানেই বাস করে পৃথিবীর 80% প্রাণী। এর থেকে এক থেকে 2 ft নিচে নামলে পোকামাকর আর ইদুরের গর্ত পাওয়া যাবে। 6 ft নিচে পর্যন্ত গর্ত খুরে সাধারণত কবর দেয়া হয়। এর থেকেও 13 ft নিচে নামলে মিশরের 3000 বছর পুরাতন রাজা তুতান খামুন আর তার ধন সম্পদ পাওয়া যাবে। প্রাচীন যুগে মিশরের রাজাদের 10 ft নিচে কবর দেয়া হতো। 20 ft নিচে পর্যন্ত মেটাল ডিটেক্টর মাটির নিচে থাকা মেটালকে খুঁজে বের করে নিতে পারবে। 23 ফিট নিচে নামলে আপনি কিউচি টানেল দেখতে পাবেন। ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় সৈনিকরা নিজেদের গোপন রাখতে,
কমিউনিকেট করতে আর আমেরিকান সেনাদের উপর সারপ্রাইজ অটাক করতে এই টানেলটাকে নির্মাণ করেছিল। 40 ফিট নিচে পর্যন্ত নাইল ক্রোকোডাইলরা গর্ত খুঁজতে পারে। এই গর্তটা কোন প্রাণীদের দ্বারা খনন করা সবথেকে গভীরতম গর্ত। 65 ফিট নিচে নামলে আপনারা দেখতে পাবেন প্যারিস কাটাকম কবরস্থান। যেখানে 60 লাখেরও বেশি মানুষের কঙ্কাল রয়েছে। অষ্টদশ শতাব্দীর দিকে প্যারিসের কবরস্থানগুলোর লাশে ভরে গিয়েছিল। সেই সময় এখানে এক ভয়ানক মহামারি ছড়িয়ে পড়েছিল। তাই ফরাসি সরকার ঠিক করে মাটির 65 ft নিচে এই লাশগুলোকে দাফন করা হবে। 180 ft নিচে
নামলে আন্ডারগ্রাউন্ড আরবান ফার্ম দেখতে পাবেন। এই ধরনের ফার্ম চীনে পাওয়া যায়। এখানে মাটির নিচে আর্টিফিশিয়াল লাইট ব্যবহার করে ফসল চাষ করা হয়। মাটির নিচে 328 ফিট গভীরে নিউক্লিয়ার ওয়েস্টকে দাফন করা হয়। যাতে মানবজাতির কোন ক্ষতি না করতে পারে। আরো একটু নিচে নামলে 346 ফিট গভীরে রয়েছে পৃথিবীর সবথেকে গভীরতম মেট্রো স্টেশন। এই মেট্রো স্টেশনটি ইউক্রেনের শহর কিবে রয়েছে। আর এটা এতটাই নিচে রয়েছে যে এখানে আসার জন্য অনেকগুলি এলিভেটরের সাহায্য নিতে হয়। 400 ফিট গভীরে নামলে সবথেকে নিচে থাকা গাছের শিখরকে দেখতে পাবেন। এই গাছটিকে আফ্রিকাতে
দেখা যায় যার নাম ওয়াইল্ড ফিক্টরি। জলের সন্ধানে এরা এতটা পর্যন্ত নিচে নামতে পারে। 500 ফিট নিচে নামলে পৃথিবীর সবথেকে গভীরতম হোটেল দেখতে পাবেন। যার নাম সালা সিলভার মাইন আন্ডারগ্রাউন্ড হোটেল। এই হোটেলটি সুইডেনে অবস্থিত। এখানে কোন ওয়াইফাই নেই, কোন মোবাইল সিগনাল নেই। কেবল মোমবাতির আলোয় আপনি শান্তিপূর্ণভাবে কিছু সময় ব্যয় করতে পারবেন। এখানের গেস্টরা কেবল রেডিওর সাহায্যেই কমিউনিকেট করতে পারে। এর থেকেও আরো নিচে মানে 720 ফিট গভীরে রয়েছে পৃথিবীর সবথেকে গভীরতম নদীর তলদেশ। এই নদীটাকে আফ্রিকাতে পাওয়া যায় যা
কঙ্গোরিবার নামে পরিচিত। কিন্তু মানুষ এর থেকেও আরো নিচে নেমেছে। 950 ফিট গভীরে রয়েছে পৃথিবীর সবথেকে গভীরতম ট্রেন টানেল। এই টানেলটি সাইকেন্ড টানেল নামে পরিচিত। যা জাপানের দুটো দ্বীপকে সংযুক্ত করে। এই টানেলটাকে এমনকি সমুদ্রের নিচে তৈরি করা হয়। 1000 ft নিচে যদি কোন ব্যক্তি লুকিয়ে বসে থাকে তাহলেও নিউক্লিয়ার মিসাইলের হাত থেকে বাঁচতে পারবে না। বি82 নিউক্লিয়ার ওয়ারহেড। এটা এমন এক মিসাইল যদি কোন জায়গায় পড়ে তাহলে 1000 ft নিচে তৈরি করা স্ট্রাকচার কেউ ধ্বংস করে দিতে পারবে। এর থেকেও আরো নিচে নামলে পাওয়া
যাবে ডেড সি বা মৃতসাগর যা সি লেভেল থেকে 432 mটার বা 1419 ft নিচে রয়েছে। এটা এতটাই নিচে এমনকি এম্পারেস্টেড বিল্ডিং ফিট হয়ে যাবে। এর থেকেও 2300 ft নিচে নামলে চিলির সানজোস মাইনে পৌঁছে যাবেন। আর এখানে 33 জন মাইনার 69 দিন পর্যন্ত খাবার জলের সাপ্লাই ছাড়া আটকেছিল। কারণ মাইনিং এর এন্ট্রি পয়েন্ট ধস নেমে ব্লক হয়ে গিয়েছিল। মাটি থেকে 3180 ফিট নিচে মানুষের দ্বারা খোরা এমন এক গর্ত রয়েছে যেখানে দাঁড়িয়ে খোলা আকাশ দেখা যায়। এই জায়গাটি বিঙ্গাম কোপার মাইন নামে পরিচিত। আর এটা এতটাই গভীর পয়েন্ট যে পৃথিবীর
সবথেকে উঁচু বিল্ডিং ব্রিজ খলিফা এর ভেতর ফিট হয়ে যাবে। 7,257 ft নিচে রয়েছে পৃথিবীর সবথেকে গভীরতম গুহা। যেটা ভেরিবো কিনা নামে পরিচিত। এটা জর্জিয়াতে রয়েছে। কিন্তু অবাক করার বিষয় হলো মানুষ এর থেকেও আরো নিচে নেমেছে। 10500 ft নিচে রয়েছে কোলার গোল্ড মাইন বা কেজিএফ। এটা কর্নাটকে রয়েছে। এই মাইন থেকে একটা সময় সোনা উত্তোলন করা হতো। কেজিএফ এর মত সুপারহিট ফিল্মকে এই মাইনটির দ্বারা ইন্সপায়ারড হয়ে বানানো হয়। 12,000 ফিট গভীরে নামলে আপনারা দেখতে পাবেন পৃথিবীর সবথেকে গভীরে বাস করা পোকা। যাকে ডেভিল ওয়ার্ম নামে ডাকা হয়। আশ্চর্যজনকভাবে এই
পোকাটা এত গভীরও বেঁচে থাকতে পারে। 13123 ft বা 4 km নিচে রয়েছে পৃথিবীর সবথেকে গভীরতম মাইন। এই মাইনটার নাম এম্পিয়নেং গোল্ড মাইন। এই মাইনটা দক্ষিণ আফ্রিকায় রয়েছে। আর এই মাইন থেকেই পৃথিবীর সবথেকে বিশুদ্ধ সোনাকে উত্তোলন করা হয়। এর ভিতরে তাপমাত্রা প্রায় 66 ডিগ্রি সেলসিয়াস এর উপরেও চলে যায়। যেখানে থেকে কাজ করা শ্রমিকদের জন্য একটা বড় চ্যালেঞ্জ। কিন্তু তারপরেও সামান্য কিছু টাকার জন্য মানুষ ঝুঁকি নিতে পিছুপা হয় না। এটা এতটাই গভীরে রয়েছে যে যদি কেউ উপর থেকে নিচে পড়ে যায় তাহলে বটমে পৌঁছাতে 30 সেকেন্ড সময় লাগবে। মানে নিচে পড়তে
পড়তে একটা মিসড কল হয়ে যাবে। এই পয়েন্ট থেকে আরো কিছুটা নিচে 2932 ফিট গভীরতা ততটাই উঁচু যতটা মাউন্ট এভারেস্ট পাহাড়ের হাইট আরো নিচে যদি 35,640 ফিট গভীরে নামা হয় তাহলে সমুদ্রের সবথেকে গভীরতম পয়েন্টে নামা হবে। 1951 সালে ব্রিটিশ শিপ এইচএমএস চ্যালেঞ্জার দড়ি দিয়ে সমুদ্রের এই পয়েন্টটাকে মেজার করে যা প্রায় 10863 মিটার গভীরে এর তল খুঁজে পায়। সমুদ্রের এই পয়েন্টটা চ্যালেঞ্জার ডিপ নামে পরিচিত। এটা এতটাই গভীর যে যদি মাউন্ট এভারেস্ট পর্বতকে উল্টো করে এর নিচে ফেলা হয় তারপরেও 2 কিলোমিটার গ্যাপ রয়ে যাবে। কিন্তু আপনি শুনলে অবাক হবেন মানুষ এর
থেকেও আরো গভীরে গর্ত খনন করেছে। 402,230 ফিট অথবা 12 কিলোমিটার নিচে মানুষের তৈরি করা সবথেকে গভীরতম গর্ত রয়েছে। যা কোলা সুপার ডিপ বোরহোল নামে পরিচিত। এই গর্তটা 23 সেন্টিমিটার চওড়া। 1997 সালে রাশিয়ার মিশন ছিল এমন একটা গর্ত খুরবে তারা যা পৃথিবীর সেন্টার পর্যন্ত পৌঁছে যাবে। কিন্তু নয় বছর ধরে কন্টিনিউ ড্রিলিং করার পর তারা এমন একটা পয়েন্টে এসে পৌঁছায় যেখানে টেম্পারেচার 200 ডিগ্রি পর্যন্ত পৌঁছে যায়। আর এর ফলে ড্রিল ইকুইপমেন্ট এতটাই গরম হয়ে যেত যে এর নিচে আর নামা তাদের কাছে সম্ভব হতো না। মানুষের দ্বারা
তৈরি করা এটাই একমাত্র গর্ত যার নিচে আজ পর্যন্ত কেউ খনন করতে পারেনি। পৃথিবী কতটা গভীর এই বিষয়টিকে জানার পূর্বে আগে আমাদের জানতে হবে পৃথিবীর লেয়ার সম্পর্কে। পৃথিবীকে চারটি লেয়ারে ভাগ করা হয়েছে। প্রথম লেয়ারের নাম ক্রাস্ট। দ্বিতীয় লেয়ারটির নাম মেন্টাল, তৃতীয় লেয়ারটির নাম আউটার কোর। আর চতুর্থটির নাম ইনার কোর। এতক্ষণ আমাদের খনন পৃথিবীর প্রথম লেয়ারে চলছিল। এই লেয়ারটা 30 থেকে 70 km মতো মোটা। আর এই ক্রাস্ট লেয়ারেই আমরা বাস করি। 70 km এর থেকে নিচে নামলে আমরা মেন্টাল লেয়ারে পৌঁছাবো। যা 2900 km
মোটা। তবে এই লেয়ারটা ট্রাস্টের মতো নয়। এটাকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়। আপার মেন্টাল আর ইনার মেন্টাল। আপার মেন্টাল 660 km নিচে পর্যন্ত রয়েছে। আর এটা লিকুইড ফর্মে থাকে। আর এখান থেকে অগ্নয়গিরি সৃষ্টি হয়। অন্যদিকে ইনার মেন্টাল ভূমিপৃষ্ঠ থেকে 2900 km গভীরে রয়েছে। তবে এটা চাপের কারণে হালকা শক্ত থাকে। অনেকটা টুথপেস্টের মত নরম। আর এটা ধীরে ধীরে ফ্লো হতে থাকে। মেন্টালের তাপমাত্রা 1000 থেকে 3000 ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত হয়ে থাকে। এরপর যখন আমরা 2900 কিলোমিটার এর নিচে নামবো তখন আমরা আউটার কোর দেখতে পাবো। এটা প্রায় 2200 কিলোমিটার পর্যন্ত মোটা হয়ে
থাকে। এর মধ্যে গলিতে লোহা আর নিকেল থাকে। আর এখানে তাপমাত্রা সর্বদা 4000 থেকে 5500 ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত হয়ে থাকে। এখানে এতটাই গরম থাকে যে কোন মজবুত উপাদান এখানে টিকে থাকতে পারে না। আর এই লেয়ারটি পৃথিবীর চুম্বকীয় শক্তিকে তৈরি করতে সাহায্য করে। যা আমাদের সূর্যের ভয়ানক রশ্শি থেকে রক্ষা করে থাকে। 5000 কিলোমিটার গভীরে নামার পর আমরা পৃথিবীর ইনার কোড দেখতে পাবো যা নিকেল আর আয়রন দ্বারা গঠিত যার তাপমাত্রা 5000 থেকে 6000 ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত হয়ে থাকে। এই তাপমাত্রাটা ঠিক সূর্যের তাপমাত্রার সমান
হয়ে থাকে। তবে প্রচন্ড প্রেসারের কারণে এই লেয়ারটা কঠিন অবস্থায় থাকে। বিজ্ঞানীদের মতে ইনার কোর আর আউটার কোর থেকেই ধাতু গোলে মেন্টাল লেয়ারের মাধ্যমে পৃথিবীর ক্রাস্টে পৌঁছায়। যেখান থেকে আমরা এগুলিকে বের করে আনি। যেমন লোহা, তামা, নিকেল, ম্যাগনেশিয়াম, অ্যালুমিনিয়াম, সোনা, রুপার মত উপাদান। এগুলোর ক্রাস্ট লেয়ারে আসার জন্য অগ্নয়গিরি আর টেকনোটিক মুভমেন্টের বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। যদি পৃথিবীর সমস্ত লেয়ারকে একসাথে জোড়া হয় তাহলে সব মিলিয়ে পৃথিবীর গভীরতা হবে প্রায় 6371 km। কারণ এরপর যখন আমরা সেন্টার ভেদ করে আরো নিচের দিকে
নামবো তাহলে সেম লেয়ারকেই দেখতে পাবো। কারণ আমরা জানি আমাদের পৃথিবী গোলাকার। মানে যদি আপনি ভাবেন পৃথিবীর এপারে গর্ত ঘুরে ওপারে যাবেন তাহলে এই গর্তটা যদি ইন্ডিয়া থেকে খোরা হয় সোজা চিলির কাছে প্যাসিফিক ওশান দিয়ে বেরিয়ে আসবে। আর এর টোটাল দূরত্ব হবে 12,742 কিলোমিটার। কিন্তু আমরা কেবল মডার্ন টেকনোলজির সাহায্যে ক্রাস্ট লেয়ারের এই 12 কিলোমিটার পর্যন্তই গর্ত খনন করতে পেরেছি। মানে যদি দুবাই পৃথিবীর সারফেস হয় তাহলে পৃথিবীর সেন্টার হবে 6371 km দূরে নর্থ কোরিয়ায়। কিন্তু আমরা মানুষেরা কেবল এখনো পর্যন্ত এই এতটা পর্যন্তই গর্ত খনন করতে পেরেছি।
ঠিক যতটা আপনারা স্ক্রিনে দেখতে পাচ্ছেন।
শেষকথা :
আমাদের এই mahabishwatvnews.com পত্রিকা ওয়েবসাইটে প্রতিনিয়ত যে নিউজ বা শিক্ষনীয় ব্লগ পোস্ট করা হয় ঠিক তেমনই আজকের এই শিক্ষনীয় আর্টিকেলটি আশাকরি আপনাদের অনেক উপকারে আসছে। 🫣
আর হ্যাঁ আজকের আর্টিকেলটি যদি আপনার ভালো লেগে থাকে তাহলে অবশ্যই আপনার বন্ধুবান্ধবদের সাথে পোস্টটি শেয়ার করবেন,যাতে তারাও এই শিক্ষণীয় আর্টিকেলটি পরে পৃথিবী কতটা গভীর তা সম্পর্কে জেনে উপকৃত হতে পারে।
আরও পোস্ট পড়ুন-
চুল পড়া বন্ধের ঘরোয়া উপায়। মহাবিশ্ব টিভি নিউজ
আসলে কেন বানানো হয়েছিল চীনের এই দেওয়াল? || Great Wall of China Mystery
পড়া মনে থাকবে - আজীবনের জন্য! 🔥 পড়া মনে রাখার ৫ টি বৈজ্ঞানিক কৌশল। Study Tips in Bangla
ভয় কাটিয়ে সফল হবার উপায় | Overcome Your Shyness and Fear | Bangla Motivational Story
