অত্যাচারী ফেরাউনের অলৌকিক কাহিনী |আল্লাহর আজাব | ইসলামিক কাহিনী। মহাবিশ্ব টিভি নিউজ

 ফেরাউন তখন মিশরের বাদশা কঠোরভাবে রাষ্ট্র পরিচালনা করত। তার শাসন ছিল কঠোর নির্মম তার বরবর অত্যাচারে ভরা। বনী ইসরাইলদের উপর তার জুলুম নির্যাতন চলত। তার বিরুদ্ধে কথা বলার কারো সাহস ছিল না। কিন্তু তার মধ্যেই ঘটে গেল এক আজব ঘটনা। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন মিশরের সবচেয়ে বড় আশীর্বাদ নীলনদ শুকিয়ে দিলেন। যে নদীর পানি দিয়ে মিশরের প্রতিটি ক্ষেত সবুজ হতো। যে পানি দিয়ে মানুষের জীবন চলত হঠাৎ সেই নদী পরিণত হলো শুকন মরুভূমিতে। ফলে সমগ্র মিশরের মানুষ পানির অভাবে হাহাকার করে উঠলো। কোন মা তাদের কোলের শিশুকে আঁকড়ে ধরে কেঁদে বলছে, ওরে আমার সন্তানের

ফেরাউনের অবিশ্বাস্য পরিণতি: আল্লাহর আজাব কি সত্যিই নেমে এসেছিল?



জন্য এক ফোঁটা পানি কোথায় পাবো? বৃদ্ধরা কাঁপতে কাঁপতে আর্তনাদ করছে। আমরা তৃষ্ণায় মারা যাচ্ছি। গ্রাম শহর জুড়ে শোনা যাচ্ছে মানুষের কান্না আর অসহায় চিৎকার। একে অপরকে বলতে লাগলো এবার আমাদের কি হবে? পানির অভাবে আমাদের জীবন মৃত্যুর মুখে ঢলে পড়েছে। মা শিশু বৃদ্ধ সবাই পানির জন্য হাহাকার করে উঠছে। কিছুদিনের মধ্যেই পানি না পেলে সবাই মৃত্যুর মুখে ঢলে পড়বে। তোমাদের কাছে কোন উপায় থাকলে বলো। এরপর একজন বলল, চলো আমরা সবাই একসাথে মিশরের সবচেয়ে বড় জ্যোতিষীর কাছে যাই। তিনি গণনা করে কোন না কোন উপায় বলবেন।


অতঃপর মানুষ ছুটলো জ্যোতিষীর কাছে। তারা কেঁদে কেঁদে সব ঘটনা খুলে বলল, হে জ্ঞানী আমাদের বাঁচান। নীলনথ শুকিয়ে গেছে। মানুষ তৃষ্ণায় কাতর। শস্য নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এবার কি হবে? জ্যোতিষী তমন বলল, আমি গণনা করে দেখতে পাচ্ছি মিশরের নীলনাথ কোনভাবেই পানিতে পরিপূর্ণ হবে না। এই সমস্যার সমাধান আমি করতে পারবো না। বরং তোমরা আমাদের প্রভু ফেরাউনের কাছে যেতে পারো। তিনি কোন না কোন ব্যবস্থা করতে পারেন। অবশেষে কোন উপায় না পেয়ে অসহায় মিশরবাসীরা তখন দৌড়ে চলল ফেরাউনের প্রাসাদের দিকে। কারণ তাদের বিশ্বাস ছিল ফেরাউনই সব সমস্যার সমাধানকারী। মানুষ একে


একে দল ভেদে ফেরাউনের দরবারে এসে উপস্থিত হলো এবং তারা হাত জোড় করে মাথা নিচু করে বলল হে আমাদের খোদা ইতিমধ্যেই শুনেছেন যে মিশরের নীলনদের পানি শুকিয়ে গেছে মানুষ পানির জন্য হাহাকার করছে নীলনদে যদি পানির ব্যবস্থা না হয় তাহলে সবাই মৃত্যুর মুখে ঢলে পড়বে আপনি তো অধিক শক্তির অধিকারী নীলনদে যাতে পানির স্রোত প্রবাহিত হয় তার একটা ব্যবস্থা করুন তাছাড়া অনেক লোকে বলছে আমাদের বাদশাহ যদি পানির ব্যবস্থা না করেন তাহলে আমরা তাকে খোদা বলে মানবো না এই কথা শোনা মাত্রই ফেরাউনের চোখ রাগে লাল হয়ে গেল অহংকারে তার বুক ফুটে উঠল কিন্তু


তখন সে কিছুই বলল না মাথা উঁচু করে গম্ভীর কন্ঠে বলল তোমরা চিন্তা করো না আমি তো তোমাদের খোদা যেভাবেই হোক অতি শীঘ্রই পানির ব্যবস্থা করে দেবো আজ তোমরা ফিরে যাও আগামীকালই অলৌকিকভাবে দেখবে নীলনদ আমার হুকুমে প্রবাহিত হবে পানিতে পরিপূর্ণ হয়ে যাবে মানুষজন সেদিন আশার আলো নিয়ে প্রাসাদ ছেড়ে চলে গেল। কিন্তু রাতে যখন চারিদিক নিস্তব্ধ ফেরাউন একা নিজের ঘরে বসে গভীর চিন্তায় ডুবে গেল। সে একা একা মনে মনে ভাবতে লাগলো আমার তো আসলেই কোন শক্তি নেই। সমস্ত শক্তির মালিক তো একমাত্র তিনি বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহ। কিন্তু


আমি যদি এই কথা জনগণের সামনে স্বীকার করি তাহলে আমাকে কেউ খোদা বলে মানবে না। আমাকে কিছু চালাকি করতে হবে। পরের দিন সকালবেলা ফেরাউন সমস্ত সেনাকে বলল, তোমরা প্রস্তুত হও। এখনই নীলনদের প্রান্তে রওনা দেব। তখন একজন সেনা বলল, হুজুর নীলনদ তো শুকিয়ে গেছে। এক বিন্দু পানি নেই। সেখানে গিয়ে কি করবেন? ফেরাউন গর্জে উঠলো। মূর্খ তুমি জানো না আমি খোদা। আমার আদেশে নীলনদ আবার পানিতে ভরে উঠবে। নদী আমার কথাই শুনবে। সৈন্যরা কেউ অবাক হয়ে তাকালো। কেউ ভয়ে কিছু বলল না। অতঃপর ফেরাউন তার নির্বাচিত সৈন্যদের নিয়ে নীল নদীর তীরে পৌঁছালো।


শুকন নদীর বালুকাময় প্রান্তরে দাঁড়িয়ে ফেরাউন গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে বলল, হে নীলনদ দরিয়া তুমি কি আমার কথা শুনতে পাচ্ছ না? আমার আদেশে এখনই পানি প্রবাহিত করো। আর সমগ্র মিশর ভরিয়ে দাও। কিন্তু নদী নিশ্চুপ। কোন স্রোত এলো না, কোন পানি দেখা গেল না। মূর্খ ফেরাউন জানত যে সমস্ত কিছুর মালিক একমাত্র আল্লাহ। কিন্তু ফেরাউন নিজের অহংকারে অন্ধ। তবু মানুষের সামনে নিজের মিথ্যা খোদায় দাবিতে টিকিয়ে রাখতে প্রাণপণ অভিনয় করতে লাগল। বারবার পানি চাওয়ার ফলে ব্যর্থ হওয়ায় সে দুশ্চিন্তায় পড়ে গেল। যদি নদীতে পানি না আসে তাহলে সাধারণ জনগণ তাকে খোদা বলে


মানবে না। শুধুমাত্র এই চিন্তাই অত্যন্ত বিমর্য ও অস্থির হয়ে পড়ল। এখন কি করা যায়? বহু চিন্তার পর ফেরাউন সেখান থেকে কয়েকজন সৈন্যকে নিয়ে সাদুল আলা নামক প্রান্তরে এসে হাজির হলো। সেখানে পৌঁছে ফেরাউন সৈন্যদেরকে বলল, তোমরা সবাই এখানে দাঁড়াও। আমি কিছু একটা ব্যবস্থা করছি। এই কথা বলে সে নিজে একা চালাকি করে তার পার্শ্ববর্তী একটি নির্জন গুহার মধ্যে চলে গেল। অতঃপর সে সি সেজদায় পড়ে গেল। কাঁদতে কাঁদতে বলল, হে পরম করুণাময় দয়ার সাগর, তোমার ক্ষমতার কোন শেষ নেই। আমি তোমার অধম বান্দা। তুমি তো করুণাময় দয়ার সাগর। এই


অধম বান্দার দোয়া তুমি কবুল করো। আমার মানসম্মান বাঁচাও। দুনিয়াতে তুমি আমার গৌরব বাঁচিয়ে রাখো। পরকালে আমি তোমার কাছে কিছুই চাই না। দরকার হলে তখন তুমি আমাকে জাহান্নামের আগুনে প্রজ্জ্বলিত করিও। তবুও দুনিয়ায় আমার মানসম্মান বাঁচিয়ে দাও। হে করুণাময় নীল দরিয়ার পানি প্রবাহিত হয় না। একদিকে যেমন মিশরের জনগণ মৃত্যুবরণ করবে। অনেক নিষ্পাপ শিশু নারী বৃদ্ধ বৃদ্ধা মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়বে। হে করুণাময় অন্তত তাদের কথা ভেবে এই দোয়া কবুল করে নাও। তোমার তো দয়ার কোন শেষ নেই। অন্যদিকে তোমার এই অধম বান্দার মানসম্মান ধুলায় মিশে যাবে। মানুষ আমাকে


ধিক্কার জানাবে। হে মহাপ্রভু হে করুণাময় আমার সম্পর্কে তুমি সর্বদা অবগত। তবুও তোমার কাছে প্রার্থনা করছি দয়া করে আমার এই প্রার্থনা কবুল করো। আমি আপনার কাছে চিরকৃতজ্ঞ থাকবো। এই কথা বলে অঝরে কাঁদতে লাগলো। ঠিক ওই সময় কোথা থেকে এক বৃদ্ধ গুহার বাইরে থেকে জোরে আওয়াজ করে বলল জাহাপনা একটু বাইরে আসবেন হঠাৎ ফেরাউন চমকে উঠলো তখন বৃদ্ধটি বলল জাপনা আমি আপনার কাছে একটি লোকের অভিযোগ নিয়ে এসেছি আপনি ন্যায় বিচার করুন গুহার মধ্য থেকে ফেরাউন বলল আপনি কে আপনাকে এখানে কে আসতে বলেছে এটা তো বিচারের জায়গা নয় আপনি


আগামীকাল রাজ দরবারে আসুন আমি আপনাকে ন্যায় বিচার শুনিয়ে দেব তখন বৃদ্ধ বলল কিন্তু আমিতো আমি তো বিচার না শুনে যাবো না। দরকার হলে আপনাকে বাইরে বার হতে দেবো না। এই কথা শুনে ফেরাউন প্রচন্ড রেগে গেল। কিন্তু সে তো এখন বিপদে তাই কিছু বলল না। গুহা থেকে বাইরে বার হবে এমন সময় সৈন্যদের চিৎকার আর উল্লাস শুনতে পেল। এটা শুনে সে হতভম্ব হয়ে গুহার বাইরে চলে এলেন এবং নীলনদের দিকে তাকিয়ে দেখলেন সমগ্র নীলনদ পানিতে পরিপূর্ণ হয়ে গেছে। এটা দেখে সে অত্যন্ত আনন্দিত হল। উদাসীন হয়ে বৃদ্ধ লোককে বলল আচ্ছা এইবার বলুন আপনার


অভিযোগটি কি? তখন বৃদ্ধ লোকটি বলল মনে করুন একটি গোলাম একেবারে অবাধ্য তার মালিকের কথা শোনে না। অথচ তার মালিক তার কাছে সৎ ব্যবহার করে। তার খাবার দেয়, পোশাক দেয়। অথচ সেই গোলাম একবারও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না। তাহলে ওই গোলামের প্রতি কেমন ব্যবহার করা উচিত? তখন ফেরাউন বলল, ওই গোলামকে নীলনদের পানিতে ডুবিয়ে মারা উচিত। তখন বিরুদ্ধেটি বলল, এই কথাটা কি তুমি কাগজে লিখে দিতে পারবে? ফেরাউন বলল, নিশ্চয়ই কেন পারবো না? এই গোলামকে তো পানিতে ডুবিয়ে মারা উচিত। অতঃপর এই কথাটি কাগজে লিখে ওই বিরুদ্ধেটির হাতে দিয়ে দিল এবং বিরুদ্ধটি সেখান থেকে


বিদায় নিলেন। এই বিরুদ্ধটি ছিলেন আর কেউ নয়। স্বয়ং আল্লাহর ফেরেশতা। অতঃপর ফেরাউন তার সৈন্য সামন্ত নিয়ে আবারো রাজ দরবারের দিকে ফিরে আসলো। এই খবর ছড়িয়ে পড়তে একটুও দেরি হলো না। মিশরের প্রতিটি প্রান্তরে গঞ্জন শুরু হয়ে গেল। গুঞ্জন শুরু হয়ে গেল। মানুষ একে অপরকে বলছিল আমাদের খোদা ফেরাউন তার ক্ষমতার বলে নীলনদে আবার পানি প্রবাহিত করেছে। একে একে রাজদরবারে আসতে লাগলো। রাজদরবারে অসংখ্য লোকের ভেরি লেগে গেল। কেউ আনন্দ করছে কেউবা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছে তারা মাথা নিচু করে বলল হে আমাদের খোদা আপনি আমাদের মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করেছেন আমরা এই


উপকার সারাজীবন ভুলবো না ফেরাউন তাপন অহংকারে বুক ফাটিয়ে হেসে বলল তোমরা ভয় পেও না আমি অনেক শক্তির অধিকারী নীলনাদে পানি আনা তো আমার জন্য সামান্য ব্যাপার এর থেকেও বড় আলোকে কিছু আমি দেখাতে পারি আমি তো বলেছিলাম তোমাদের জন্য আমি পানির ব্যবস্থা করে দেব লোকেরা তার তাই আরো বিময়ীত হয়ে গেল। তারা ফেরাউনকে খোদা বলে ডাকা শুরু করল। আবারো জোরে আবারো সম্মানের সাথে। দরবারে সবার প্রশংসা স্রোত বইতে লাগলো। আর ফেরাউন পূর্বের সব কথা ভুলে গেল। সে ভুলে গেল আসল শক্তির অধিকারীকে। ভুলে গেল সেই এক আল্লাহর দয়া ছাড়া সে এক


বিন্দু পানি আনতে পারতো না। বরং সে নিজের অহংকারে আরো ডুবে গেল। নিজেকে মনে করতে লাগলো যেন সত্যি সেই সবকিছুর মালিক। বছরের পর বছর কেটে গেল। ফেরাউনের নিষ্ঠরতা আরো বেড়ে গেল। রাষ্ট্র পরিচালনায় সে হয়ে উঠলো আগের থেকেও কঠোর। তার মনে অহংকারের পাহাড় সমান উঁচু হয়ে উঠলো। সময় বয়ে চলল। এক বছর নয় দুই বছর নয় তিন বছর। মিশরের আকাশে এক ফোঁটা বৃষ্ট নামলো না। মাটি ফেটে গেল। ফসল নষ্ট হলো। গবাদী পশু মারা গেল। আর মানুষ দিন দিন হাহাকার করতে লাগলো। মিশরে পরপর তিন বছর বৃষ্টি না হয়ে দুর্ভিক্ষ দেখা দিল। অবশেষে একদিন অসংখ্য


মানুষ ফেরাউনের দরবারে এসে হাজির হলো এবং সবাই বলল, আপনি তো আমাদের খোদা। আপনি কোন ব্যবস্থা করুন। দেশে এতটাই দুর্ভিক্ষ যে মানুষ না খেয়ে মারা যাচ্ছে। তখন ফেরাউন তাদের কথা শুনে রাগে গর্জে উঠলো এবং বলল, এই দুর্ভিক্ষ আমার কারণে নয়। সবকিছুর দায়ী হলো ওই মুসা। তার অপচেষ্টা তার জঘন্য কার সাজির কারণেই মিশরের এই ব্যবস্থা মুসার কারণেই দুর্ভিক্ষ হয়েছে। তোমরা সবাই তার কাছে যাও। দেখি সে তার খোদাকে বলে তোমাদের জন্য কি করতে পারে। তখন সকল জনগণ ফেরাউনের কথামত হযরত মুসা আলাইহিস সালামের নিকট হাজির হলো এবং বলল হে মুসা তুমি যদি তোমার খোদাকে বলে এই


করাল দুর্ভিক্ষের ছোবল থেকে আমাদের রক্ষা করতে পারো তাহলে আমরা মেনে নেব তুমি আল্লাহর সত্য নবী এবং তোমার খোদার প্রতি ঈমান আনবো। তখন হযরত মূসা আলাইহিস সাল্লাম একাকি ঘরের মধ্যে চলে গেলেন এবং মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের কাছে দোয়া করে বললেন, আল্লাহ তুমি তো বিশ্বজগতের প্রতিপালক। তুমি দয়ার সাগর হে আল্লাহ এই অভুক্ত মানুষের প্রতি রহম করো তাদের এই ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ থেকে মুক্তি দাও তোমার রহমতের বৃষ্টি দান করো আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তার নবীর দোয়া কবুল করলেন হঠাৎ আকাশ কালো মেঘে ঢেকে গেল বিদ্যুৎ চমকালো তারপর প্রবল বৃষ্টির ধারা নেমে এল মিশরের


শুকন মাটি ভিজে উঠলো ক্ষেত খামার আবার সবুজে ভরে গেল অতঃপর হযরত মুসা আলাইহিস সাল্লাম সে সকল লোকদের কাছে গিয়ে বলল হে প্রিয় প্রিয় ভাইয়েরা এবার আপনারা ঈমান আনুন। এক আল্লাহ ছাড়া কোন উপাস্য নয়। তিনি আমাদের রব। এই কথা শোনা মাত্রই ওই লোকগুলো অট্টহাসি করে বলল, হে মুসা তোমার কথা আমরা শুনবো না। কারণ আমাদের প্রভু ফেরাউন এবং আমাদের দেব দেবীর দয়ায় দেশে প্রচুর বৃষ্টি হয়েছে এবং আবারো শস্য উৎপাদন হয়েছে। হযরত মূসা আলাইহিস সাল্লামের কথা তারা শুনলো না। অতঃপর মূসা আলাইহিস সাল্লাম বাড়িতে ফিরে আসলেন। কিন্তু তবুও ফেরাউনের অহংকার


কমলো না। সে জনগণের সামনে দাঁড়িয়ে ঘোষণা করল, দেখছো তো আমার কারণেই আকাশ থেকে বৃষ্টি নামলো। আমি যদি খোদা না হতাম তবে কি এভাবে দুর্ভিক্ষ দূর হতো? হযরত মুসা আলাইহিস সালামের দোয়ায় আল্লাহর রহমত নেমে এল। অথচ প্রতারক নিষ্ঠুর ফেরাউন তার মিথ্যা খোদার দাবিকে অটুট রাখতে চাইল। কিছুদিন পর মিশরে আবারো নামলো একের পর এক বিপদ আল্লাহর গজব ধেয়ে এলো ফেরাউন ও তার জাতির উপর প্রথমে নেমে এলো প্রবাল বন্যা নীলনথ উথলে উঠলো সবকিছু ভাসিয়ে নিয়ে গেল মানুষ চিৎকার করে উঠলো আমরা কোথায় আশ্রয় নেব বাড়ি ঘর ক্ষেত খামার গাবাদী পশু সব


ভেসে গেল বন্যার জোয়ারে কিন্তু ফেরাউন সে তার রাজ সিংহাসনে বসে অহংকারে হেসে বলল এতো কেবল প্রাকৃতিক ঘটনা এর সাথে আমার খোদাই হবার কোন সম্পর্ক নেই। কিছুদিন পর ধেয়ে এলো আবারো ভয়ঙ্কর শাস্তি। মিশরের প্রতিটি ক্ষেত জুড়ে নেমে এলো পঙ্গপালের কালো ঝড়। লাখো কোটি পঙ্গপাল নেমে এসে মুহূর্তের মধ্যে গম, জব, ধান সব গিলে খেল। এরপর দেখা দিল নতুন এক বিপদ। উকুনের উপদ্র। মানুষের শরীর, কাপড়, ঘরবাড়ি সবখানে উকুনে ভরে গেল। মানুষ চুলকাতে চুলকাতে পাগল হয়ে উঠলো। শিশুর কান্না বৃদ্ধার আর্তনাদ চারিদিকে শোনা যেতে লাগলো। কিন্তু আল্লাহর গজব এখানেই থামলো না। হঠাৎ মিশরের


নদী, খালবিল থেকে অসংখ্য বিষাক্ত ব্যাঙ বেরিয়ে এল। রাস্তা, বাড়ি, খাবারের হাড়ি, পানির পাত্র সব জায়গায় ব্যাঙে ভরে গেল। কিন্তু ফেরাউন ক্ষমতার শিখরে রাজসিংহাসনে বসে অহংকারে ফেটে পড়েছে। চারিদিকে সেনা সামন্ত দাস-দাসী এমন ভয়াবহ অবস্থায়। একদিন ফেরাউনের এক সেনা দৌড়ে এসে বলল, হুজুর এক অদ্ভুত ঘটনা ঘটেছে। কোথা থেকে যে হাজার হাজার বিষাক্ত ব্যাঙ এসে পড়েছে। মানুষ অতিষ্ট হয়ে গেছে। কেউ আর স্বাভাবিকভাবে বাঁচতে পারছে না। ফেরাউন অট্টহাসি দিয়ে বলল, তুমি কি স্বপ্ন দেখছো? ব্যাঙ আমার মানুষকে কষ্ট দেবে কেমন করে? তুমি ভয় পাওয়ার দুর্বল সৈন্য ছাড়া


আর কিছুই নও। কিন্তু সেনার চোখে ছিল আতঙ্কের ছাপ। সে কাঁপা গলায় বলল, না হুজুর এটি স্বপ্ন নয়। মিশরের প্রতিটি ঘরে প্রতিটি রাস্তায় ব্যাঙে ভরে গেছে। মানুষ চিৎকার করছে অসহায় হয়ে পড়েছে। ফেরাউন এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হলো। তার বুক কেঁপে উঠলো। কারণ সে জানতো এগুলো কোন প্রাকৃতিক ঘটনা নয়। এগুলো আল্লাহর পক্ষ থেকে পাঠানো আযাব। যা বারবার তাকে সতর্ক করছে। কিন্তু ফেরাউন নিজের অহংকারী অন্ধ। সে সত্য জেনেও মিথ্যার উপর দাঁড়িয়ে থেকে নিজের খোদার দাবিকে আঁকড়ে ধরল। অন্যদিকে মিশরের সাধারণ মানুষ আতঙ্কিত হয়ে একে


অপরকে বলছে আজ অদ্ভুত সবকিছু ঘটছে। পানির ভিতর চারিদিকে ব্যাঙ আর ব্যাঙ লাখো লাখো ব্যাঙ ছেয়ে গেল। মিশরের নদীনালা রাস্তা ঘরের ভিতর থেকে শুরু করে খাবারের হাড়ির পাতিল পর্যন্ত কোথাও আর ব্যাঙ মুক্ত নেই। অবশেষে একদল লোক ফেরাউনের দরবারে এসে উপস্থিত হলো এবং তারা বলল হুজুর তুমি তো বলেছিলে তুমি শক্তিশালী তোমার দেবতারা শক্তিশালী তবে আজ একি হলো ব্যাঙের দল আমাদের ঘুম কেড়ে নিয়েছে সন্তানরা ভয়ে কাঁদছে খাবার পানি নষ্ট হয়ে গেছে ফেরাউন প্রথমে হেসে উড়িয়ে দিল সে বলল এ কিছুই না আমাদের দেবতারা চাইলে মুহূর্তে সব শেষ


করে দেবে তোমরা চিন্তা করো না এর ব্যবস্থা করছি তোমরা এখন বাড়িফি ফরে যাও। অতঃপর তারা বাড়ি ফিরে গেল। কিন্তু ব্যাঙের দঙ্গল থামলো না। বরং দিন দিন বাড়তেই লাগলো। সৈন্যদের বুটের ভেতর, রান্নাঘরের হাড়ির ভেতর। এমনকি ফেরাউনের প্রাসাদের বিছানার উপর পর্যন্ত ব্যাঙ লাফিয়ে লাফিয়ে উঠে গেল। তখন ফেরাউন চিৎকার করে বলল, তোমরা যাও মুসাকে এখনই ডেকে আনো। আমি তার সাথে চুক্তি করতে চাই। দুইজন সেনা হযরত মূসা আলাইহিস সাল্লামকে এই খবর পৌঁছে দেওয়ার জন্য রওনা হলো। কিন্তু রাস্তার মাঝেই দেখল কিছু লোক হযরত মুসা আলাইহিস সালামকে বলছে


হে মুসা তুমি আমাদের বিপদ থেকে উদ্ধার করো। তোমার আল্লাহর কাছে দোয়া করো। এই গজব যেন সরিয়ে নেয়। যদি তুমি এটা করতে পারো তাহলে আমরা প্রতিজ্ঞা করছি অবশ্যই তোমার আল্লাহর প্রতি ঈমান আনবো এবং তোমাকে সত্য নবী বলে মানবো। এই কথা শেষ হলেই সৈন্য দুটি তার কাছে গিয়ে সমস্ত কথা খুলে বলল। তখন হযরত মুসা আলাইহিস সালাম আর দেরি করলো না। সাথে সাথেই ফেরাউনের রাজ দরবারে হাজির হলো। হযরত মুসা আলাইহিস সালামকে দেখা মাত্র ফেরাউন বলল, হে মুসা তোমার প্রতিপালকের কাছে দোয়া করো যেন এই ব্যাঙ আমাদের থেকে দূর হয়। আমি কথা দিচ্ছি


তোমার জাতিকে মুক্তি দেব এবং তোমাকে সত্য নবী বলে মেনে নেব। সমগ্র জনগণের কথা চিন্তা করে শিশু বৃদ্ধ আর নিষ্পাপ মানুষের কথা চিন্তা করে হযরত মূসা আলাইহিস সাল্লামের হৃদয় গলে গেল। অবশেষে বাড়ি ফিরে মূসা আলাইহিস সাল্লাম আল্লাহর কাছে দোয়া করলেন। অল্প সময়ে শহর থেকে ব্যাঙ দূর হয়ে গেল। মানুষের মনে স্বস্তি ফিরল। অন্যদিকে ফেরাউন এর মধ্যেই মানুষকে বুঝিয়ে রেখেছে যে আমার ক্ষমতার বলে ব্যাঙ দূর হয়েছে। অতঃপর হযরত মুসা আলাইহিস সাল্লাম ওই লোকদের কাছে গিয়ে বলল হে প্রিয় ভাইয়েরা এখন তো বিপদমুক্ত হয়েছো। অতএব তোমরা আল্লাহর উপর ঈমান আনো। কিন্তু


তারা অট্টহাসি করে বলল, আমরা তোমার আল্লাহর প্রতি ঈমান আনবো কেন? তোমার আল্লাহর দ্বারা কোন ভালো ফল হয়নি। যা কিছু হয়েছে ফেরাউনের দ্বারাই সম্ভব হয়েছে। অতঃপর হযরত মূসা আলাইহি সাল্লাম ফেরাউনের রাজ দরবারে হাজির হলো এবং ফেরাউনকে বলল তুমি তো বলেছিলে তুমি তো চুক্তি করেছিলে এই বিপদ মুক্ত হলে আল্লাহর প্রতি ঈমান আনবে কিন্তু নিষ্ঠুর প্রতারক ফেরাউন তার চুক্তি ভেঙে দিল সে হেসে বলল আমি প্রতিশ্রুতি মানবো না আমি মিশরের সর্বশক্তিমান প্রভু এই কথা শুনে হযরত মুসা আলাইহিস সাল্লাম খুবই চিন্তিত মনে ফিরতে লাগলেন। এভাবেই ফেরাউনের মিথ্যাচার আর


অহংকার বাড়তেই লাগলো। অথচ সে ভুলে গেল এটা ছিল আল্লাহর একটি মাত্র গজব আরো ভয়ঙ্কর গজব তার জন্য অপেক্ষা করছে। অতঃপর আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ফেরাউন ও তার অনুসারীদের প্রতি বিরক্ত রাগন্ডিত হয়ে হযরত মুসা আলাইহিস সালামকে আদেশ করলেন, হে মুসা, তুমি বনী ইসরাইলগণকে নিয়ে এক রাতে গোপনে মিশর থেকে বার হয়ে যাও। তোমরা সকলেই নীল নদের তীরে উপস্থিত হবে। তোমাদেরকে কৌশলে নদী পার করে দেব এবং ফেরাউন ও তার অনুসারীদের নীলনদের জলে ডুবিয়ে মারবো। অবশেষে আল্লাহর নির্দেশে হযরত মুসা আলাইহিস সাল্লাম তার অনুসারীদের নিয়ে মহররম মাসের 9 তারিখে দিবাগত রাত্রে


গোপনে রওনা হলো। হযরত হারুন আলাইহিস সাল্লাম কাফেলার পথ দেখিয়া চলতে লাগলেন। কিন্তু উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো এতগুলো লোক নিয়ে হযরত মুসা আলাইহিস সালাম যখন মিশর থেকে রওনা হচ্ছে কেউ দেখতে পেল না। কারণ হলো সেই সময় মিশরে কলেরা রোগের মহামারী দেখা দিয়েছিল। যখন হযরত মুসা আলাইহিস সাল্লাম ও হারুন আলাইহিস সাল্লাম তার অনুসারীদের নিয়ে মিশর থেকে নীলনাথ অভিমুখে রওনা হচ্ছে ঠিক সেই সময় এক সেনা তাদেরকে দেখতে পেল। সে দেরি না করেই সঙ্গে সঙ্গে ফেরাউনের কাছে গিয়ে বলল হুজুর মুসা তার অনুসারীদের নিয়ে এই দেশ থেকে পালাচ্ছে। এই খবর শুনে ফেরাউন খুবই রেগে


চিৎকার করে উঠলো এবং বলল এই মুহূর্তে সেনাবাহিনী প্রস্তুত করো। প্রতিটি বনী ইসরাইলদেরকে আমি উচিত শিক্ষা দেব। এই নির্দেশ অনুযায়ী কুড় লক্ষ অশারোহী সেনাসহ নীলনথ অভিমুখে রওনা হলো। সামনে চলল ফেরাউন। এদিকে হযরত মুসা আলাইহিস সাল্লাম তার অনুসারীদের নিয়ে নীলনদের তীরে দাঁড়িয়েছিলেন। ঠিক সেই সময় মুহূর্তেই হযরত জিব্রাইল আলাইহিস সাল্লাম এসে বললেন, আপনি আল্লাহর নাম নিয়ে আপনার লাঠি দ্বারা নদীতে আঘাত করুন। হযরত মূসা আলাইহিস সাল্লাম লাঠি দ্বারা আঘাত করা মাত্রই নদীর বক্ষে সুপ্রস্থ রাস্তা বের হয়ে গেল। অতঃপর হযরত মুসা আলাইহিস সাল্লাম ও তার


অনুসারীগণ সেই রাস্তা দিয়েই বারোটি কাফেলা অনায়াসে পার হয়ে গেলেন। তারা পিছনে ফিরে দেখলেন ফেরাউনের সৈন্যরা বিশাল বাহিনী নিয়ে নদীর তীরে এসে পড়েছে। এটা দেখে হযরত মূসা আলাইহিস সাল্লামের অনুসারীগণ অত্যন্ত আতঙ্কিত হয়ে পড়লেন। তারা চিন্তা করতে লাগলো এবার যদি ফেরাউনের সেনাদের হাতে ধরা পড়ে তবে আর তাদের কোন নিস্তার থাকবে না। এদিকে ফেরাউন নদীর তীরে পৌঁছে নীলনদের মাঝে শুকনো রাস্তা দেখে এমন অলৌকিক ঘটনা দেখে বিস্ময় হতভাগ হয়ে গেল মনে মনে ভাবল এটা মুসার কোন জাদুঘটিত ব্যাপার নয়তো এই নদীর উপর দিয়ে পার হলে


কোন বিপদ ঘটবে না তো আবার ভাবছে যদি এখনই না রওনা হই তাহলে তারা নাগালের বাইরে চলে যাবে তখন তাদের পাকড়াও করা সম্ভব হবে না ফেরাউন একটা চিন্তায় পড়ে গেল ঠিক ওই মুহূর্তেই হযরত জিব্রাইল আলাইহি সাল্লাম একজন সৈনিক বেশে অশু নিয়ে উক্ত রাস্তার উপর দিয়ে নদী পার হয়ে গেলেন। এই ঘটনা দেখে ফেরাউনের মনে আরো সাহসের সঞ্চয় হলো। তখন ফেরাউন অশু নিয়ে ওই রাস্তার উপর দিয়ে নদী পার হতে লাগলো। আর দেখাদেখি পেছনের সৈন্যগুলো সেদিকেই রওনা হলো। ঠিক যখন তারা নদীর মাঝে এসে উপস্থিত হলো ওই মুহূর্তেই রাস্তার অপর দিক থেকে পাহাড়


সমান উঁচু আটকানো পানি। সমুদ্রের জলস্বাস্থ্যের মত হৃদয় কাঁপন গর্জন করে রাস্তাগুলিকে নিশ্চিহ্ন করে দিল। ফেরাউন এবং তার সৈন্য সামন্তকে গেরাস করে ফেলল। সমগ্র সেনাসামন্ত নীলনদের পানিতে ডুবে মরল। একটি লোকও বাঁচতে পারল না। এদিকে বনী ইসরাইলগণ নদীর অপর প্রান্ত থেকে ফেরাউন ও তার সৈন্য সামন্তকে এমন অবস্থায় দেখে আনন্দে উল্লাস ধ্বনি করতে লাগল। ফেরাউন যখন নদীর পানিতে হাবুডুবু খাচ্ছে তখন হযরত মুসা আলাইহিস সালাম দাঁড়িয়ে ছিলেন। এটা দেখে ফেরাউন বলল হে মুসা অনুগ্রহ করে আমাকে বাঁচাও। আমি তোমার আল্লাহর প্রতি ঈমান আনবো এবং আল্লাহর নবী বলে তোমাকে


বিশ্বাস করব। কিন্তু হযরত মুসা আলাইহিস সাল্লাম তার ডাকে সাড়া দিলেন না। কোন কোন তাফসীরকারক বর্ণনা করেছেন। যখন ফেরাউন নীল নদের পানিতে মৃত্যুর মুখোমুখী তখন হযরত জিব্রাইল আলাইহিস সালাম বললেন, ফেরাউন আজ তুমি বিধায় মিনতি করছো। তোমার মত অবাধ্য বান্দার পরিণতি কি হওয়া উচিত তা তুমি নিজের হাতে লিখে দিয়েছিলে। এই দেখো সে লিখিত কাগজ যাতে সে নিজেই লিখেছিল অবাধ্য গোলামকে পানিতে ডুবিয়ে মারা উচিত। আর এভাবেই নিষ্ঠুর ফেরাউন নীলনদের পানিতে তার মৃত্যু হলো। আল্লাহর শক্তির কাছে ফেরাউনের সিংহাসন কিছুই নয়। যে মানুষ নিজেকে


সর্বশ্রেষ্ঠ প্রভু দাবি করেছিল সাগরের উত্তাল ঢেউয়ে সে ছিল এক ক্ষুদ্র পোকামাত্র। আল্লাহ তার দেহকে সমুদ্রের তলায় লুকিয়ে রাখলেন না। বরং দুনিয়ার মানুষের জন্য রেখে দিলেন চিরকালীন সতর্ক বার্তা হিসেবে। অহংকার মানুষকে ধ্বংস করে। আর ঈমান মানুষকে উঁচু করে। যারা আল্লাহর পথে ধৈর্য ধরে তাদের জন্য জাহান্নামের দরজা খুলে যায়। প্রিয় দর্শক আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে যেন অহংকার থেকে দূরে রাখে এবং সঠিক পথে চলার তৌফিক দান করেন। আমরা সবাই বলি আমিন। আসসালামু আলাইকুম। [মিউজিক]


নদী, খালবিল থেকে অসংখ্য বিষাক্ত ব্যাঙ বেরিয়ে এল। রাস্তা, বাড়ি, খাবারের হাড়ি, পানির পাত্র সব জায়গায় ব্যাঙে ভরে গেল। কিন্তু ফেরাউন ক্ষমতার শিখরে রাজসিংহাসনে বসে অহংকারে ফেটে পড়েছে। চারিদিকে সেনা সামন্ত দাস-দাসী এমন ভয়াবহ অবস্থায়। একদিন ফেরাউনের এক সেনা দৌড়ে এসে বলল, হুজুর এক অদ্ভুত ঘটনা ঘটেছে। কোথা থেকে যে হাজার হাজার বিষাক্ত ব্যাঙ এসে পড়েছে। মানুষ অতিষ্ট হয়ে গেছে। কেউ আর স্বাভাবিকভাবে বাঁচতে পারছে না। ফেরাউন অট্টহাসি দিয়ে বলল, তুমি কি স্বপ্ন দেখছো? ব্যাঙ আমার মানুষকে কষ্ট দেবে কেমন করে? তুমি ভয় পাওয়ার দুর্বল সৈন্য ছাড়া


আর কিছুই নও। কিন্তু সেনার চোখে ছিল আতঙ্কের ছাপ। সে কাঁপা গলায় বলল, না হুজুর এটি স্বপ্ন নয়। মিশরের প্রতিটি ঘরে প্রতিটি রাস্তায় ব্যাঙে ভরে গেছে। মানুষ চিৎকার করছে অসহায় হয়ে পড়েছে। ফেরাউন এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হলো। তার বুক কেঁপে উঠলো। কারণ সে জানতো এগুলো কোন প্রাকৃতিক ঘটনা নয়। এগুলো আল্লাহর পক্ষ থেকে পাঠানো আযাব। যা বারবার তাকে সতর্ক করছে। কিন্তু ফেরাউন নিজের অহংকারী অন্ধ। সে সত্য জেনেও মিথ্যার উপর দাঁড়িয়ে থেকে নিজের খোদার দাবিকে আঁকড়ে ধরল। অন্যদিকে মিশরের সাধারণ মানুষ আতঙ্কিত হয়ে একে


অপরকে বলছে আজ অদ্ভুত সবকিছু ঘটছে। পানির ভিতর চারিদিকে ব্যাঙ আর ব্যাঙ লাখো লাখো ব্যাঙ ছেয়ে গেল। মিশরের নদীনালা রাস্তা ঘরের ভিতর থেকে শুরু করে খাবারের হাড়ির পাতিল পর্যন্ত কোথাও আর ব্যাঙ মুক্ত নেই। অবশেষে একদল লোক ফেরাউনের দরবারে এসে উপস্থিত হলো এবং তারা বলল হুজুর তুমি তো বলেছিলে তুমি শক্তিশালী তোমার দেবতারা শক্তিশালী তবে আজ একি হলো ব্যাঙের দল আমাদের ঘুম কেড়ে নিয়েছে সন্তানরা ভয়ে কাঁদছে খাবার পানি নষ্ট হয়ে গেছে ফেরাউন প্রথমে হেসে উড়িয়ে দিল সে বলল এ কিছুই না আমাদের দেবতারা চাইলে মুহূর্তে সব শেষ


করে দেবে তোমরা চিন্তা করো না এর ব্যবস্থা করছি তোমরা এখন বাড়িফি ফরে যাও। অতঃপর তারা বাড়ি ফিরে গেল। কিন্তু ব্যাঙের দঙ্গল থামলো না। বরং দিন দিন বাড়তেই লাগলো। সৈন্যদের বুটের ভেতর, রান্নাঘরের হাড়ির ভেতর। এমনকি ফেরাউনের প্রাসাদের বিছানার উপর পর্যন্ত ব্যাঙ লাফিয়ে লাফিয়ে উঠে গেল। তখন ফেরাউন চিৎকার করে বলল, তোমরা যাও মুসাকে এখনই ডেকে আনো। আমি তার সাথে চুক্তি করতে চাই। দুইজন সেনা হযরত মূসা আলাইহিস সাল্লামকে এই খবর পৌঁছে দেওয়ার জন্য রওনা হলো। কিন্তু রাস্তার মাঝেই দেখল কিছু লোক হযরত মুসা আলাইহিস সালামকে বলছে


হে মুসা তুমি আমাদের বিপদ থেকে উদ্ধার করো। তোমার আল্লাহর কাছে দোয়া করো। এই গজব যেন সরিয়ে নেয়। যদি তুমি এটা করতে পারো তাহলে আমরা প্রতিজ্ঞা করছি অবশ্যই তোমার আল্লাহর প্রতি ঈমান আনবো এবং তোমাকে সত্য নবী বলে মানবো। এই কথা শেষ হলেই সৈন্য দুটি তার কাছে গিয়ে সমস্ত কথা খুলে বলল। তখন হযরত মুসা আলাইহিস সালাম আর দেরি করলো না। সাথে সাথেই ফেরাউনের রাজ দরবারে হাজির হলো। হযরত মুসা আলাইহিস সালামকে দেখা মাত্র ফেরাউন বলল, হে মুসা তোমার প্রতিপালকের কাছে দোয়া করো যেন এই ব্যাঙ আমাদের থেকে দূর হয়। আমি কথা দিচ্ছি


তোমার জাতিকে মুক্তি দেব এবং তোমাকে সত্য নবী বলে মেনে নেব। সমগ্র জনগণের কথা চিন্তা করে শিশু বৃদ্ধ আর নিষ্পাপ মানুষের কথা চিন্তা করে হযরত মূসা আলাইহিস সাল্লামের হৃদয় গলে গেল। অবশেষে বাড়ি ফিরে মূসা আলাইহিস সাল্লাম আল্লাহর কাছে দোয়া করলেন। অল্প সময়ে শহর থেকে ব্যাঙ দূর হয়ে গেল। মানুষের মনে স্বস্তি ফিরল। অন্যদিকে ফেরাউন এর মধ্যেই মানুষকে বুঝিয়ে রেখেছে যে আমার ক্ষমতার বলে ব্যাঙ দূর হয়েছে। অতঃপর হযরত মুসা আলাইহিস সাল্লাম ওই লোকদের কাছে গিয়ে বলল হে প্রিয় ভাইয়েরা এখন তো বিপদমুক্ত হয়েছো। অতএব তোমরা আল্লাহর উপর ঈমান আনো। কিন্তু


তারা অট্টহাসি করে বলল, আমরা তোমার আল্লাহর প্রতি ঈমান আনবো কেন? তোমার আল্লাহর দ্বারা কোন ভালো ফল হয়নি। যা কিছু হয়েছে ফেরাউনের দ্বারাই সম্ভব হয়েছে। অতঃপর হযরত মূসা আলাইহি সাল্লাম ফেরাউনের রাজ দরবারে হাজির হলো এবং ফেরাউনকে বলল তুমি তো বলেছিলে তুমি তো চুক্তি করেছিলে এই বিপদ মুক্ত হলে আল্লাহর প্রতি ঈমান আনবে কিন্তু নিষ্ঠুর প্রতারক ফেরাউন তার চুক্তি ভেঙে দিল সে হেসে বলল আমি প্রতিশ্রুতি মানবো না আমি মিশরের সর্বশক্তিমান প্রভু এই কথা শুনে হযরত মুসা আলাইহিস সাল্লাম খুবই চিন্তিত মনে ফিরতে লাগলেন। এভাবেই ফেরাউনের মিথ্যাচার আর


অহংকার বাড়তেই লাগলো। অথচ সে ভুলে গেল এটা ছিল আল্লাহর একটি মাত্র গজব আরো ভয়ঙ্কর গজব তার জন্য অপেক্ষা করছে। অতঃপর আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ফেরাউন ও তার অনুসারীদের প্রতি বিরক্ত রাগন্ডিত হয়ে হযরত মুসা আলাইহিস সালামকে আদেশ করলেন, হে মুসা, তুমি বনী ইসরাইলগণকে নিয়ে এক রাতে গোপনে মিশর থেকে বার হয়ে যাও। তোমরা সকলেই নীল নদের তীরে উপস্থিত হবে। তোমাদেরকে কৌশলে নদী পার করে দেব এবং ফেরাউন ও তার অনুসারীদের নীলনদের জলে ডুবিয়ে মারবো। অবশেষে আল্লাহর নির্দেশে হযরত মুসা আলাইহিস সাল্লাম তার অনুসারীদের নিয়ে মহররম মাসের 9 তারিখে দিবাগত রাত্রে


গোপনে রওনা হলো। হযরত হারুন আলাইহিস সাল্লাম কাফেলার পথ দেখিয়া চলতে লাগলেন। কিন্তু উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো এতগুলো লোক নিয়ে হযরত মুসা আলাইহিস সালাম যখন মিশর থেকে রওনা হচ্ছে কেউ দেখতে পেল না। কারণ হলো সেই সময় মিশরে কলেরা রোগের মহামারী দেখা দিয়েছিল। যখন হযরত মুসা আলাইহিস সাল্লাম ও হারুন আলাইহিস সাল্লাম তার অনুসারীদের নিয়ে মিশর থেকে নীলনাথ অভিমুখে রওনা হচ্ছে ঠিক সেই সময় এক সেনা তাদেরকে দেখতে পেল। সে দেরি না করেই সঙ্গে সঙ্গে ফেরাউনের কাছে গিয়ে বলল হুজুর মুসা তার অনুসারীদের নিয়ে এই দেশ থেকে পালাচ্ছে। এই খবর শুনে ফেরাউন খুবই রেগে


চিৎকার করে উঠলো এবং বলল এই মুহূর্তে সেনাবাহিনী প্রস্তুত করো। প্রতিটি বনী ইসরাইলদেরকে আমি উচিত শিক্ষা দেব। এই নির্দেশ অনুযায়ী কুড় লক্ষ অশারোহী সেনাসহ নীলনথ অভিমুখে রওনা হলো। সামনে চলল ফেরাউন। এদিকে হযরত মুসা আলাইহিস সাল্লাম তার অনুসারীদের নিয়ে নীলনদের তীরে দাঁড়িয়েছিলেন। ঠিক সেই সময় মুহূর্তেই হযরত জিব্রাইল আলাইহিস সাল্লাম এসে বললেন, আপনি আল্লাহর নাম নিয়ে আপনার লাঠি দ্বারা নদীতে আঘাত করুন। হযরত মূসা আলাইহিস সাল্লাম লাঠি দ্বারা আঘাত করা মাত্রই নদীর বক্ষে সুপ্রস্থ রাস্তা বের হয়ে গেল। অতঃপর হযরত মুসা আলাইহিস সাল্লাম ও তার


অনুসারীগণ সেই রাস্তা দিয়েই বারোটি কাফেলা অনায়াসে পার হয়ে গেলেন। তারা পিছনে ফিরে দেখলেন ফেরাউনের সৈন্যরা বিশাল বাহিনী নিয়ে নদীর তীরে এসে পড়েছে। এটা দেখে হযরত মূসা আলাইহিস সাল্লামের অনুসারীগণ অত্যন্ত আতঙ্কিত হয়ে পড়লেন। তারা চিন্তা করতে লাগলো এবার যদি ফেরাউনের সেনাদের হাতে ধরা পড়ে তবে আর তাদের কোন নিস্তার থাকবে না। এদিকে ফেরাউন নদীর তীরে পৌঁছে নীলনদের মাঝে শুকনো রাস্তা দেখে এমন অলৌকিক ঘটনা দেখে বিস্ময় হতভাগ হয়ে গেল মনে মনে ভাবল এটা মুসার কোন জাদুঘটিত ব্যাপার নয়তো এই নদীর উপর দিয়ে পার হলে


কোন বিপদ ঘটবে না তো আবার ভাবছে যদি এখনই না রওনা হই তাহলে তারা নাগালের বাইরে চলে যাবে তখন তাদের পাকড়াও করা সম্ভব হবে না ফেরাউন একটা চিন্তায় পড়ে গেল ঠিক ওই মুহূর্তেই হযরত জিব্রাইল আলাইহি সাল্লাম একজন সৈনিক বেশে অশু নিয়ে উক্ত রাস্তার উপর দিয়ে নদী পার হয়ে গেলেন। এই ঘটনা দেখে ফেরাউনের মনে আরো সাহসের সঞ্চয় হলো। তখন ফেরাউন অশু নিয়ে ওই রাস্তার উপর দিয়ে নদী পার হতে লাগলো। আর দেখাদেখি পেছনের সৈন্যগুলো সেদিকেই রওনা হলো। ঠিক যখন তারা নদীর মাঝে এসে উপস্থিত হলো ওই মুহূর্তেই রাস্তার অপর দিক থেকে পাহাড়


সমান উঁচু আটকানো পানি। সমুদ্রের জলস্বাস্থ্যের মত হৃদয় কাঁপন গর্জন করে রাস্তাগুলিকে নিশ্চিহ্ন করে দিল। ফেরাউন এবং তার সৈন্য সামন্তকে গেরাস করে ফেলল। সমগ্র সেনাসামন্ত নীলনদের পানিতে ডুবে মরল। একটি লোকও বাঁচতে পারল না। এদিকে বনী ইসরাইলগণ নদীর অপর প্রান্ত থেকে ফেরাউন ও তার সৈন্য সামন্তকে এমন অবস্থায় দেখে আনন্দে উল্লাস ধ্বনি করতে লাগল। ফেরাউন যখন নদীর পানিতে হাবুডুবু খাচ্ছে তখন হযরত মুসা আলাইহিস সালাম দাঁড়িয়ে ছিলেন। এটা দেখে ফেরাউন বলল হে মুসা অনুগ্রহ করে আমাকে বাঁচাও। আমি তোমার আল্লাহর প্রতি ঈমান আনবো এবং আল্লাহর নবী বলে তোমাকে


বিশ্বাস করব। কিন্তু হযরত মুসা আলাইহিস সাল্লাম তার ডাকে সাড়া দিলেন না। কোন কোন তাফসীরকারক বর্ণনা করেছেন। যখন ফেরাউন নীল নদের পানিতে মৃত্যুর মুখোমুখী তখন হযরত জিব্রাইল আলাইহিস সালাম বললেন, ফেরাউন আজ তুমি বিধায় মিনতি করছো। তোমার মত অবাধ্য বান্দার পরিণতি কি হওয়া উচিত তা তুমি নিজের হাতে লিখে দিয়েছিলে। এই দেখো সে লিখিত কাগজ যাতে সে নিজেই লিখেছিল অবাধ্য গোলামকে পানিতে ডুবিয়ে মারা উচিত। আর এভাবেই নিষ্ঠুর ফেরাউন নীলনদের পানিতে তার মৃত্যু হলো। আল্লাহর শক্তির কাছে ফেরাউনের সিংহাসন কিছুই নয়। যে মানুষ নিজেকে


সর্বশ্রেষ্ঠ প্রভু দাবি করেছিল সাগরের উত্তাল ঢেউয়ে সে ছিল এক ক্ষুদ্র পোকামাত্র। আল্লাহ তার দেহকে সমুদ্রের তলায় লুকিয়ে রাখলেন না। বরং দুনিয়ার মানুষের জন্য রেখে দিলেন চিরকালীন সতর্ক বার্তা হিসেবে। অহংকার মানুষকে ধ্বংস করে। আর ঈমান মানুষকে উঁচু করে। যারা আল্লাহর পথে ধৈর্য ধরে তাদের জন্য জাহান্নামের দরজা খুলে যায়। প্রিয় দর্শক আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে যেন অহংকার থেকে দূরে রাখে এবং সঠিক পথে চলার তৌফিক দান করেন। আমরা সবাই বলি আমিন। আসসালামু আলাইকুম। 


শেষকথা :


আমাদের এই mahabishwatvnews.com পত্রিকা ওয়েবসাইটে প্রতিনিয়ত যে নিউজ বা শিক্ষনীয় ব্লগ পোস্ট করা হয় ঠিক তেমনই আজকের এই শিক্ষনীয় আর্টিকেলটি আশাকরি আপনাদের অনেক উপকারে আসছে। 🫣


আর হ্যাঁ আজকের আর্টিকেলটি যদি আপনার ভালো লেগে থাকে তাহলে অবশ্যই আপনার বন্ধুবান্ধবদের সাথে পোস্টটি শেয়ার করবেন,যাতে তারাও এই শিক্ষণীয় আর্টিকেলটি পড়ে "অত্যাচারী ফেরাউনের অলৌকিক কাহিনী |আল্লাহর আজাব | ইসলামিক কাহিনী। মহাবিশ্ব টিভি নিউজ" সম্পর্কে জেনে উপকৃত হতে পারে।


আরও পোস্ট পড়ুন-


খাজা মঈনুদ্দিন চিশতী রহঃ এর যে কারামত দেখে ৯০ লাখ হিন্দু মুসলমান হয়েছ | আজমিরের পুরো কাহিনী | মহাবিশ্ব টিভি নিউজ 


 গরিব মূর্তিকারের জাদুকরী টিয়া পাখি | Bangla story | bangla cartoon | Bengali Fairy Tales Cartoon


গ্রামে থেকেই লাখের ব্যবসা শুরু করুন! একটাই প্যাকেটের রহস্যে লুকিয়ে আছে কোটি টাকার সুযোগ 


কোনো অফিস ছাড়া, কোনো অভিজ্ঞতা ছাড়া ৫টি ছোট ব্যবসার আইডিয়া | 5 small business ideas


জীবন পরিবর্তনের সেরা লেকচার | ডক্টর নোবেল | Doctor Nobel | Motivational Speech | মোটিভেশনাল স্পিকার




একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন